পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উদ্যোগ ও বিনিয়োগ বাড়ছে। এর ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, গত বছর বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা ২০২৩ সালের তুলনায় রেকর্ড ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এতে সঞ্চালন লাইনগুলোয় সক্ষমতা ৫৮৫ গিগাওয়াট বেড়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সি (আইআরইএনএ)। তবে রেকর্ড সত্ত্বেও এখনো বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে এ প্রবৃদ্ধি। খবর আরব নিউজ।
সংস্থাটি বলেছে, ২০২৪ সালে নতুন অবকাঠামো স্থাপন নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা ৪ হাজার ৪৪৮ গিগাওয়াটে নিয়ে গেছে। আইআরইএনএ সতর্ক করে জানাচ্ছে, বৈশ্বিক লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তিন গুণে নেয়া। এটি পূরণে ১১ দশমিক ২ টেরাওয়াট সক্ষমতা প্রয়োজন, যা বর্তমান বৃদ্ধির হারে যথেষ্ট নয়। দশক শেষে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতার বার্ষিক ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
চলতি মাসের শুরুতে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। সেখানে বলা হয়েছে, গত বছর জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি ছিল নবায়নযোগ্য উৎসে ৩৮ শতাংশ। এরপর প্রাকৃতিক গ্যাস ২৮ শতাংশ, কয়লা ১৫, জ্বালানি তেল ১১ ও পারমাণবিক শক্তি ৮ শতাংশ।
তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইনস্টলেশনে আইইএর দেয়া পূর্বাভাস আইআরইএনএর তুলনায় বেশি ছিল। আইইএ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে নতুন নবায়নযোগ্য ইনস্টলেশন টানা ২২তম বছরে রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রায় ৭০০ গিগাওয়াট সংযোজন হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল সৌর ফটোভোলটাইক বা পিভি।
আইআরইএনএর মহাপরিচালক ফ্রান্সেসকো লা ক্যামেরা জানান, কপ২৮-এ গৃহীত সিদ্ধান্ত ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তিন গুণ করতে হবে। সে লক্ষ্য অর্জনে মাত্র ছয় বছর রয়েছে। এ হিসাবে প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় উষ্ণায়ন বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে প্রতি বছর ১ হাজার ১২০ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে সরকারগুলোকে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নিতে হবে বলে মন্তব্য ফ্রান্সেসকো লা ক্যামেরার। পরবর্তী ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস (এনডিসি) হালনাগাদ করার সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি স্পষ্ট রূপরেখা নির্ধারণ প্রয়োজন। এনডিসি হলো প্যারিস চুক্তির অধীনে দেশগুলোর স্বেচ্ছায় দেয়া প্রতিশ্রুতি। যার মাধ্যমে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা জানায় সরকারগুলো।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গ্লোবাল সাউথ অঞ্চলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বানও করেন আইআরইএনএ মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করছি। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর ও সহজেই বাস্তবায়নযোগ্য তার প্রমাণ এটি। প্রতি বছর খাতটি পূর্ববর্তী রেকর্ড ভাঙছে, কিন্তু একই সঙ্গে আমরা আঞ্চলিক বৈষম্য ও ২০৩০ সালের সময়সীমার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত সম্প্রসারণ মানেই ব্যবসার সুযোগ গ্রহণ করা এবং দ্রুত ও টেকসই উপায়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
আইআরইএনএর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারণ হয়েছে সৌর ও বায়ুশক্তির, যা মোট নবায়নযোগ্য সংযোজনের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ দখলে নিয়েছে। সৌরশক্তি ৩২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮৬৫ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট সম্প্রসারণের তিন-চতুর্থাংশের বেশি। এরপর বায়ু শক্তি বেড়েছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৪ সালে চীনে ২৭৮ গিগাওয়াট সৌরশক্তি সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, ভারতে যুক্ত হয়েছে ২৪ দশমিক ৫ গিগাওয়াট।
আইআরইএনএর প্রতিবেদন সম্পর্কে জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানির যুগের অবসান ঘটাচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এ রেকর্ড সম্প্রসারণ কর্মসংস্থান তৈরি করছে, বিদ্যুতের বিল কমছে ও বায়ু পরিচ্ছন্ন হচ্ছে।’
আইআরইএনএর তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে জলবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১ হাজার ২৮৩ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা চীনের প্রবৃদ্ধির কারণে ২০২৩ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার দেখিয়েছে। এছাড়া গত বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী বায়ু শক্তি সক্ষমতা ১ হাজার ১৩৩ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, এতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
অন্যদিকে জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুতের সম্প্রসারণ হয়েছে ৪ দশমিক ৬ গিগাওয়াট, যা আগের বছর ছিল ৩ গিগাওয়াট। চীন ও ফ্রান্সের দেশ দুটি সঞ্চালন লাইনে ১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট করে যোগ করেছে। ভূতাপীয় শক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন দশমিক ৪ গিগাওয়াট বেড়েছে। এ প্রযুক্তিতে শীর্ষে ছিল নিউজিল্যান্ড, এর পরের অবস্থান ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের।
ইউরেশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা বাদ দিয়ে অফ-গ্রিড বিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৪ দশমিক ৩ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে।
লা ক্যামেরার ভাষ্যে, বর্তমানে বৈশ্বিক ইনস্টলকৃত বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৪৬ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। তা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় অনেক প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে গ্রিডের নমনীয়তা ও পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন নিয়ে ভাবতে হবে।